logo
ঢাকাবৃহস্পতিবার , ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১

চাষের জমিতে কাঁচ ছিটানোর অভিযোগ আওয়ামীলীগ নেতার বিরুদ্ধে

নিজস্ব প্রতিনিধি | দৈনিক বিবর্তন
ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২১ ৬:০৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলায় জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে চাষের জমিতে কাঁচ ভেঙে ছিটিয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে একাধিক আওয়ামীলীগ নেতার বিরুদ্ধে। করোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে যখন এক ইঞ্চি জমিও বাদ না দিতে সরকারের নির্দেশনা, তখন চাষ বন্ধ করতে এমন অভিনব কৌশলের আশ্রয় নেয়ার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু অভিযুক্তদের দাবি ইউপি নির্বাচন কে কেন্দ্র করে রহিম চৌধুরী নামের একজন প্রার্থীকে (যিনি এ ঘটনায় অভিযুক্ত) চাপে রাখতে বর্তমান চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমানের যোগসাজশে এ কাজ করেছে বাদীরা।

ঘটনার শিকার উপজেলার পাঠানদন্ডী গ্রামের আবদুর রহমান ডাক্তারের বাড়ির মৃত এরশাদ আলীর ছেলে মতিউর রহমান (৭০) চন্দনাইশ থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। এতে বিবাদী করা হয়েছে একই গ্রামের মকবুলের বাপের বাড়ির মৃত আছহাব মিয়ার ছেলে সেলিম উদ্দীন (৫০) , কলিম উদ্দীন (৪৫) , রহিম উদ্দীন (৪০) এবং মােসলেম খাঁনের ছেলে আনােয়ার (৪৫) , মঈন উদ্দীন (৪০) , ইয়াছিন প্রকাশ ইয়াছু(৩৫ ) , রাসেল (৩৪) কে। এদের মধ্যে সেলিম উদ্দীন বরকল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি, রহিম উদ্দীন ব্যবসায়ী ও কৃষক লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত, মোসলেম খাঁনের ছেলে মঈন উদ্দীন ইউনিয়ন যুবলীগের সাবেক আহবায়ক বলে জানা গেছে।

সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে চলতি বােরো মৌসুমে চাষের জন্য জমিতে সেচের পানি দেয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু ভুক্তভোগীদের সে ৪০ শতক জমিতে এখানে-সেখানে ছড়িয়ে আছে বোতল ও অন্যান্য কাঁচের ভাঙা টুকরো। আলামত হিসেবে কিছু কাঁচ পুলিশ জব্দ করেছে। তবে পানি এলে একেবারেই নামা অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে এমন শঙ্কায় এরমধ্যে কিছু কাঁচ ভুক্তভোগীরা উঠিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কাঁচে টুকরো পুরো জমিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় পা কাটার ভয়ে জমিতে চাষ করতে পারছে না তারা। কাজে আনা যাচ্ছে না কোনো মাঠ-শ্রমিককেও। ফলে অনাবাদি পড়ে থাকার আশঙ্কা করছেন জমির মালিকেরা।

ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ১ ফেব্রুয়ারী সকালে জমিতে গিয়ে তারা দেখতে পান পুরাে জমিতে কাঁচ ভাঙ্গার টুকরা পড়ে আছে। সম্পূর্ণ জমিতে কাঁচ ভাঙ্গা ছিটিয়ে দেয়ার কারণে কৃষক জমিতে নামতে পারে নি।

পুলিশের কাছে করা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, “পাঠানদন্ডী মৌজার আর.এস খতিয়ান নং- ৪৩৯ , আর.এস দাগ নং -১৬৭ এর ৪০ শতক নাল জমি , আমার রেজিস্ট্রীযুক্ত দলিল নং -১২৫৬ , তাং -২৮ / ০৫ / ১৯৪৫ ইং মূলে ভােগ দখলীয় সম্পত্তি হয় । যা আমি খরিদ পরবর্তী এ যাবত নিরবচ্ছিন্ন ভাবে নিজে এবং চাষার মাধ্যমে চাষাবাদ করিয়া ভােগ দখল করিয়া আসিতেছি । বর্ণিত বিবাদীগন আমার উক্ত জমির প্রতি অন্যায় লােভের বশবর্তী হইয়া জোর পূর্বক জবর দখলের চেষ্টা করিয়া আসিতেছে । বর্নিত বিবাদীগন আমার উল্লেখিত তপশীলের জমির শান্তিপূর্ণ ভােগদখলে বিভিন্ন ভাবে বাঁধা প্রদান করিয়া আসিতেছে।”

এতে বাদী আরও উল্লেখ করেছেন, “বিবাদীগন বিরোধের জের ধরিয়া প্রতিহিংসা পরায়ণ হইয়া আমার উক্ত জমিতে যাহাতে চাষাবাদ করিতে না পারি তৎজন্য কাঁচ ভাঙ্গা ছড়াইয়া দিয়াছে।”

এ বিষয়ে মতিউর রহমান জানান, “এটা আমার বাপ-চাচার খরিদা সম্পত্তির। প্রায় এক কানি( ১.২১ বিঘা) জমিতে ছোটো-ছোটো কাঁচ ভাঙ্গা ছিটিয়েছে তারা। সকালে গিয়ে এ অবস্থায় পাই। এলাকায় আমাদের আর কোনো শত্রু নাই। এরা ছাড়া কারো সাথে কোনো বিরোধ নাই। তারাই এসব কাজ করেছে। এবং আমাদের অন্যান্য জমিতেও খনন করে মাছের প্রজেক্ট, পোল্ট্রি ফার্ম করতেছে। আমি এডিএম কোর্টে মামলা দায়ের করেছি।”

তিনি আরও বলেন “১৯৪২ ইংরেজিতে এ জমি নিলাম হয়েছিল। পরে ১৯৪৫ সালে নিলাম খরিদদারের কাছ থেকে কিনে নিয়ে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত বি.এস জরিপ সহ ভোগ দখলে স্থিত আছি। কিন্তু তারা এটা নিয়ে বারবার জবরদখল করতে চেষ্টা করছে। সে বিরােধের জের ধরে আমরা জমিতে যেন চাষাবাদ করতে না পারি সেজন্য কাঁচ ভাঙ্গা ছড়িয়ে দিয়েছে।”

এ ঘটনায় অভিযুক্ত সেলিম উদ্দীন নিজেকে বরকল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি পরিচয় দিয়ে বলেন, “এটা আমার মুরশী(পৈতৃক) সম্পত্তি। এখন ভাই, জায়গা সম্পত্তি এইটা নিয়ে আপনার সাথে আমার সাথে দ্বন্দ্ব আছে। মাটির সাথে তো নাই। আমি ১৪৫ ধারায় নিষেধাজ্ঞা নিয়ে এসেছি এখানে বিশৃঙ্খলা স্থগিত থাকার জন্য। এতো টাকা খরচ করার পরে আমি কেনো চাঁরা(কাঁচ ভাঙ্গা) দেব?”

অপর বিবাদী পক্ষ মোসলেম খাঁনের ছেলে মঈনুদ্দীন ইউনিয়ন যুবলীগের সাবেক আহবায়ক দাবি করে বলেন, “শুনেছি আমার চাচাতো ভাই রহিম চেয়ারম্যান নির্বাচনে দাঁড়াবে। প্রতিপক্ষ বর্তমান চেয়ারম্যান( হাবিবুর রহমান) সহ এরা সহযোগিতা করে একে(রহিম) ফাঁসানোর জন্য মিথ্যা ঘটনাটা এভাবে রটাচ্ছে। এরা দিয়ে(কাঁচ ভাঙ্গা) এভাবে রটাচ্ছে।”

এ বিষয়ে বরকল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন তিনি ঘটনা শুনেছেন এবং যথাযথভাবে পি.আর থানার দিতে বলেছিলেন। তবে রহিম চৌধুরীকে ফাঁসানোর অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, “এতটুক আমার মাথায় নাই। আমি বলেছি যেই করুক আপনারা থানার আশ্রয় নেন। যারা এ ধরনের বাজে চিন্তার বিকাশ ঘটাচ্ছে তারা ‘ব্লাডি ননসেন্স’, বাজে মানুষ, শয়তান কোথাকার। তারা কি মানুষের বাচ্চা না কুকুরের বাচ্চা?

তবে অভিযুক্ত রহিম চৌধুরীকে বারবার ফোন দিয়েও কথা বলতে পারে নি প্রতিবেদক।

ঘটনাটি তদন্তে দায়িত্বে ছিলেন চন্দনাইশ থানার উপ-পরিদর্শক মোহাম্মদ আরিফ বলেন, “জমিতে কাঁচ ভাঙ্গা ছিটানোর আলামত পাওয়া গেছে। দুপক্ষকেই ডেকেছিলাম। কিন্তু কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষী না পাওয়াতে তাদের দোষারোপের ভিত্তিতে কিছু করতে পারছি না। একপক্ষ সম্ভবত কোর্টে যাবে। আমি জিডিতে নোট দিয়ে রাখছি।”

এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে এলাকার বেশকিছু মানুষের কৃষি জমি, যাতায়াতের রাস্তা ইত্যাদি অবৈধভাবে দখল করার অভিযোগ রয়েছে।

দৈনিক বিবর্তন এর প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।